সম্প্রতি শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’ লেখা বিতর্কিত বস্তায় চাল বিতরণের ঘটনায় তদন্তের মুখে পড়া কমলনগর উপজেলা এলএস ডি নিজের ভুল স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে তিনি জানিয়েছেন, এটি ছিল অনিচ্ছাকৃত এবং জনবল সংকটের কারণেই ঘটেছে।
একই সঙ্গে তিনি জানান, এই বিতর্কিত বস্তাগুলো তাঁর নিজের গোডাউনের মজুত থেকে তোলা হয়নি; বরং জেলা / সদর গোডাউন থেকে পাঠানো চালের বস্তা তিনি বিতরণ করেছেন মাত্র। এখন আইনি জটিলতায় আটকা পড়া এই কর্মকর্তার বয়ানে উঠে এসেছে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবতার চিত্র।
তদন্তের মুখে পড়া কমলনগর উপজেলা এলএস ডি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন,
“আমি দায় এড়াতে চাই না। আমার গোডাউন থেকে বিতরণ করা কিছু বস্তায় ওই লেখা ছিল। কিন্তু সেটা কি ইচ্ছাকৃত ছিল? মোটেও না। আমার অধীনে মাত্র ৪-৫ জন কর্মচারী। গোডাউনে চালের স্তূপ। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বারবার চাপ পড়ছিল ‘স্টক খালি করো, নতুন চাল আসবে’। লেখা মুছতে গেলে সময় লাগত, জনবলও নেই। তাই কী আর করব! বাধ্য হয়ে বিতরণ করেছি।”কমলনগর উপজেলা এলএস ডি আরও জানান, সম্প্রতি সদর গোডাউন থেকে বিতরণের জন্য বিপুল পরিমাণ চাল পাঠানো হয়, যার অধিকাংশ বস্তাতেই ছিল বিতর্কিত লেখা।
আমি যখন সদর থেকে চাল পেয়েছি, তখন তো সেটা আমার হাতে এসেছে তৈরি অবস্থায়। আমার কি ক্ষমতা আছে সদর অফিসের পাঠানো চালের —বস্তা পরীক্ষা করার? অথবা শত শত বস্তা থেকে লেখা মুছে ফেলার মতো জনবল কোথায় পাব? এখন তদন্ত হচ্ছে আমার বিরুদ্ধে, অথচ যে সদর অফিস থেকে এই বস্তা পাঠিয়েছে, তাদের কোনো তদন্ত হচ্ছে না কেন?”
জানা গেছে, খাদ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মৌখিকভাবে বস্তা পরিবর্তন বা লেখা মুছে ফেলার কথা বললেও, লিখিত কোনো নির্দেশনা বা অতিরিক্ত জনবল বরাদ্দ দেয়নি। ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কার্যকরীভাবে কিছুই করতে পারেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন খাদ্য কর্মকর্তা বলেন,
“উপর থেকে বলে দেওয়া সহজ, কিন্তু বাস্তবে নামার সময় কেউ থাকে না। আমরা যারা মাঠে কাজ করি, তাদের সামনে হয় নির্দেশ অমান্য করার অপরাধ, না হয় দায়িত্ব পালনের অপরাধ— এই দ্বৈত সংকট। এখন তদন্ত হচ্ছে আমাদেরই।”
আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনায় সদর গোডাউন থেকে শুরু করে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত অনেকের ভূমিকা আছে। কিন্তু বিভাগীয় তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে শুধু মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের। এটাকে বলা যায় প্রশাসনের ‘স্কেপগোট’ সিনড্রোম, যেখানে বড় ভুলের দায় নিতে হয় ছোট কর্মকর্তাদের।
কমলনগর এলএস ডি বলেন,
“আমার পরিবার, সন্তান নিয়ে চিন্তায় আছি। আমি চাকরি নিয়ে নয়, সততার সঙ্গেই কাজ করেছি। প্রশাসনের উচিত পুরো ঘটনার শিকড় পর্যন্ত তদন্ত করা, শুধু আমার মতো একজন ফিল্ড অফিসারকে দায়ী করে থেমে না যাওয়া। আমি প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচার চাই।
জনবল সংকট, উচ্চ পর্যায়ের পাঠানো বস্তা, এবং প্রশাসনিক চাপ— এই তিন কারণে একজন খাদ্য কর্মকর্তা আজ অপরাধীর কাঠগড়ায়। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো: যিনি শুধু নির্দেশ পালন করেছেন, তিনিই কি একমাত্র দায়ী? নাকি দায় নিতে হবে সেই ব্যবস্থাকেও, যার ফাঁক গলে এই বিতর্কিত বস্তা বিতরণের অনুমতি পেয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, কে সত্যিই শিকার আর কে অপরাধী।
মন্তব্য করুন